হোটেল রিজেন্সির জমির মূল মালিক রাজউক কর্মচারি কল্যাণ ট্রাস্টঃ ট্রাস্ট সভাপতি

পুঁজিবাজার রিপোর্ট: শেয়ারবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য রোডশো সম্পন্ন করা ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের বিরুদ্ধে শুধু যে প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের আভিযোগ তাই নয়। কোম্পানিটির প্রসপেক্টাসেও রয়েছে নানা অসংগতি। কোম্পানিটির ভবন এবং জায়গা নিয়ে রয়েছে আরও গুরুতর অভিযোগ।

রিজেন্সির প্রসপেক্টাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, যে ভবনে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলটি রয়েছে সেটি মোট পনের তলা। বিল্ডিংয়ের মোট ফ্লোর স্পেসের পরিমাণ ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯২৫.৩৭ স্কয়ার ফিট। এর মধ্যে ঢাকা রিজেন্সির মালিকানায় রয়েছে ১ লাখ ৫৪ হাজার ৫৭ স্কয়ার ফিট। ওই পরিমাণ স্পেসের মধ্যে ৬ষ্ঠ তলা থেকে ১৩ তলা পর্যন্ত শাহাজালাল ব্যাংক উত্তরা শাখায় বন্ধক রেখে ঋণ নেয়া হয়েছে। আর ১৪ তলার ২৬ হাজার ৭৯৪.৩৪ স্কয়ার ফিট এবং কার পার্কিং স্পেস বেজমেন্ট-২ ইন্ডাষ্ট্রিয়াল প্রমোশন অ্যান্ড ডেভলোপমেন্ট কোম্পানি অব বাংলাদেশ (আইপিডিসি) এর কাছে বন্ধক রাখা আছে।

নানা অভিযোগের বোঝা নিয়ে পুঁজিবাজারে আসছে ঢাকা রিজেন্সি –পর্ব ২

এদিকে শেয়ারবাজারে ছাড়ার জন্য রিজেন্সি হোটেলের প্রস্তুতকৃত প্রসপেক্টাসে সম্পদের হিসাবে দেখানো হয়েছে, হোটেল ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে রাজউক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে প্লট কিনে । অথচ পুঁজিবাজার ডটকমের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে, ২৩.৮৬৫ কাঠার জায়গাটি এবং ভবনের মালিক হচ্ছে রাজউক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাষ্ট্র। তাদের কাছ থেকে ফ্লোর কিনেছে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল। সেই সূত্রে তারা মালিকানা দাবি করছেন। ওই ভবনের এক থেকে চার তলা পযর্ন্ত রাজউক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাষ্ট্রের মার্কেট রয়েছে। সেটি উল্লেখ করা হয়নি বরং প্রসপেক্টাসে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে বুঝা যাচ্ছে পুরো ভবনটিই ঢাকা রিজেন্সির নিজস্ব মালিকানার।

কোম্পানিটির প্রথম দিকে মুনাফার পরিমাণ বেশি হলেও ক্রমাগত তা কমতে থাকে। ঢাকা রিজেন্সির ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, এটির কর পরবর্তী মুনাফা ধারাবাহিক ভাবে কমেছে। ২০১৫ সালে নীট মুনাফা করেছে ১৪ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ২৫৬ টাকা, ২০১৪ সালে ১৮ কোটি ৬৫ লাখ ৭৬ হাজার ৯০৫ টাকা, ২০১৩ সালে ১৯ কোটি ৮৭ লাখ ৫৬ হাজার ৯০৫ টাকা, ২০১২ সালে ২০ কোটি টাকার কিছু কম এবং ২০১১ সালে ২০ কোটি ৭৩ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৯ টাকা আয় করেছে।

তবে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, তারা ২০১৪ সালে আড়াই মাস ঢাকা রিজেন্সি পরিচালনা করেছেন তখন তারা দেখেছেন প্রতি মাসে হোটেলটির আয় হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা। তাহলে এক বছরে আয় হওয়ার কথা ১০৮ কোটি টাকা। কিন্ত আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটি যা উল্লেখ করেছে তাতে প্রকৃত আয় নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন অনেক বিনিয়োগকারী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের সেক্রেটারি মিজানুর রহমান পুঁজিবাজার ডটকমকে বলেন, ঢাকা রিজেন্সির সাথে কারো কোনো সমস্যা হয়নি, দন্দ্বও নেই। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কথা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, এটা হোটেলের সাথে নয়, এটি বিনিয়োগকারী ও পরিচালকদের ব্যাক্তিগত দন্দ্ব। আর অর্থ আত্নসাতের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, দুদক ঢাকা রিজেন্সিকে ক্লিন সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছে। হোটেলের মুনাফা কমের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ব্যবসা মন্দা ছিল তাই মুনাফাও কম হয়েছে।

এদিকে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের সস্পদের হিসাব নিয়েও রয়েছে নানা ধরনের গোজামিলের অভিযোগ। কোম্পানিটি যে বিল্ডিংয়ে হোটেল স্থাপন করেছেন সেটির মূল মালিক রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(রাজউক) কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট। তাদের কাছ থেকে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট কোম্পানি ১৪টি ফ্লোর কিনে নিয়েছেন।

অভিযোগ আছে, হোটেলটি করার সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে হোটেল নির্মাণের নামে কোটি কোটি টাকা নেয়া হয়েছে। হোটেল তৈরি করার সময় বলা হয়েছিল হোটেলটির উদ্যোক্তা মুসলেহ আহম্মদ, কবির রেজা এবং আরিফ মোতাহারসহ চার উদ্যোক্তা প্রকল্পে ৫২ শতাংশ বিনিয়োগ করবে। কিন্তু প্রবাসীরা জানতে পেরেছেন এবং প্রমাণ পেয়েছেন ওই চারজন ৫২ শতাংশ বিনিয়োগ করেননি। তারপরও তারা ৫২ শতাংশের মালিকানা দখল করে আছে। বিনিয়োগকারীদের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে হোটেল মালিক পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রবাসীরা মাত্র ২ শতাংশ শেয়ারের মালিক।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ৬ অক্টোবর লন্ডনে রিজেন্সির কাছ থেকে প্রতারিত হয়ে প্রবাসী বাংলাদেশীরা এক সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে তারা জানিয়েছিলেন, ২০০৫ সালে হোটেলের উদ্যোক্তারা ঢাকা রিজেন্সি লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি ব্রিটিশ কোম্পানি হাউজে রেজিষ্ট্রেশন করে এবং ঐ কোম্পানির ডিরেক্টরশীপ বিক্রি করতে প্রচারণা চালায় এবং বলা হয় এটি হবে একটি লন্ডন ভিত্তিক কোম্পানি। একই সময়ে তারা বাংলাদেশে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল লিমিটেড নামে আরেকটি কোম্পানি রেজিষ্ট্রেশন করে। বাংলাদেশে ঢাকা ব্যাংকে ঐ কোম্পানির একটি একাউন্ট খোলা হয়। প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের টাকা ঐ একাউন্টে জমা নেয়া হয়।

কিছু দিন পর বাংলাদেশে নিবন্ধন করা কোম্পানিটি বিলুপ্ত করে ব্যাংকে জমা দেয়া অর্থ একজন উদ্যোক্তার ব্যাক্তিগত একাউন্টে নিয়ে নেয়া হয়। এর পর ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট নামে আরেকটি কোম্পানি করে তারা হোটেলটি প্রতিষ্ঠা করে। যেখানে প্রবাসী বাংলাদেশীদের ডিরেক্টর হিসেবে না রেখে শুধু শেয়ার হোল্ডার হিসেবে রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয় নিজেদের স্ত্রী এবং মাসহ অনুগতদের নিয়ে কোম্পানির ডিরেক্টর বোর্ড গঠন করা হয় বলেও ওই সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল।(এখানে ক্লিক করে সংবাদ সম্মেলনের পুরো বিবরণ ওই সময়ের লন্ডন থেকে প্রকাশিত “সাপ্তাহিক পত্রিকায়” পড়ুন)।

এদিকে শেয়ারবাজারে ছাড়ার জন্য রিজেন্সি হোটেলের প্রস্তুতকৃত প্রসপেক্টাসে সম্পদের হিসাবে দেখানো হয়েছে, হোটেল ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে রাজউক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে প্লট কিনে । অথচ পুঁজিবাজার ডটকমের অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে, ২৩.৮৬৫ কাঠার জায়গাটি এবং ভবনের মালিক হচ্ছে রাজউক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাষ্ট্র। তাদের কাছ থেকে ফ্লোর কিনেছে ঢাকা রিজেন্সি হোটেল। সেই সূত্রে তারা মালিকানা দাবি করছেন। তবে এর হার কত তা কোম্পানির প্রসপেক্টাসে উল্লেখ করা হয়নি। ওই ভবনের এক থেকে চার তলা পযর্ন্ত রাজউক কর্মচারী কল্যাণ ট্রাষ্ট্রের মার্কেট রয়েছে। সেটি উল্লেখ করা হয়নি বরং প্রসপেক্টাসে বিষয়টি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যাতে বুঝা যাচ্ছে পুরো ভবনটিই ঢাকা রিজেন্সির নিজস্ব মালিকানার।

এছাড়া রাজউক কল্যান ট্রাষ্ট থেকে ফ্লোরের সাথে কত হার অনুপাতে জমির মালিকানা রয়েছে সে বিষয়েও কিছুই উল্লেখ করেনি কোম্পানিটি তাদের প্রসপেক্টাসে।

এ বিষয়ে রাজউক কর্মচারি কল্যাণ ট্রাস্ট্রের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান পুঁজিবাজার ডটকমকে বলেন, ঢাকা রিজেন্সি আমাদের কাছ থেকে ফ্লোর স্পেস কিনে নিয়েছে। তারা ডেভলপার কোম্পানির নিয়েমে আমাদের জমির মালিকানা পাবে। কিন্তু জমির মূল মালিক  রাজউক কর্মচারি কল্যাণ ট্রাষ্ট।