বিনিয়োগই কাল হলো ১২০ প্রবাসীর! লাভ ১৬ মামলা, মারধর ও কারাবাস

(সাপ্তাহিক ‘সাপ্তাহিক’) – ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট। সুন্দর, মনোরম একটা পাঁচতারা হোটেল। অনেকেই সেখানে যাচ্ছেন, রাঙিয়ে নিচ্ছেন জীবনের কিছু ক্ষণ! কিন্তু কেউ কি জানেন, এই হোটেলটা গড়ে উঠেছে যাদের পরিশ্রমের টাকায়, তারা আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় জেল খাটছেন! এসব থেকে পালানোর রাস্তা খুঁজছেন কেউ কেউ! এর ওর কাছে ধরনা দিতে দিতে তাদের নাওয়া খাওয়া হারাম। স্বাভাবিক আয় রোজগারের দিকেও মনোযোগ দিতে পারছেন না তারা। ফলে অনেক পরিবারকে পথে বসতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন প্রবাস জীবনে আয় করা সমস্ত অর্থ রিজেন্সিতে বিনিয়োগ করেছিলেন। সেখান থেকে লাভের লাভ হিসাবে এখন পর্যন্ত পেয়েছেন ১৬টি মামলা। দেশে এসে সপ্তায় সপ্তায় মামলার হাজিরা দিতে দিতে অবস্থা খারাপ। একজনকে মারধর করে বুকের একটা হাড় ভেঙে আবার প্রবাসে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তারা ছুটে গেছেন বিভিন্ন দপ্তরে, নিজ দেশের কনস্যুলেটের কাছে। কিছুই হচ্ছে না। কী করবেন এই মানুষগুলো! যার কাছে যান, সেই মনে করে বিদেশি পার্টি! এরা তো টাকার বস্তা! সবাই ভুলভাল বুঝিয়ে যে যেমন পারছেন খসিয়ে নিচ্ছেন! ফলে কোনো কোনো পরিবারকে কয়েক যুগ প্রবাসে কাটালেও আয় রোজগারের সঙ্কটে পড়ে এখন দেশে ফেরার কথা ভাবতে হচ্ছে। বিনিয়োগ করাটাই কাল হলো তাদের। টানা ২৬ দিন জেল খেটে গত সপ্তাহে শাহ আশরাফ ইসলাম জামিনে বের হলেও এখনও জেলে আছেন মজিদ খান, বদরুদ্দোজা সাগর ও নূরুজ্জামান লাভলু নামক তিন প্রবাসী। প্রতারণার ঘটনাক্রম বিনিয়োগের এ খতিয়ান প্রকাশ হলে এদেশে আর কেউ বিনিয়োগ করতে আসবে না, নিশ্চিত বলা চলে। ১৫০ প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন আর মাত্র ১২০ জন এর সঙ্গে যুক্ত আছেন। বাকিরা নিজেদের দেয়া টাকার কিছু অংশ তুলে নিয়ে যেভাবে পেরেছেন এখান থেকে সরেছেন। এসবের পেছনে আছেন রিজেন্সি হোটেলের তিন উদ্যোক্তা পরিচালক। এরা হচ্ছেন মুসলেহ আহমেদ, কবির রেজা ও আরিফ মোতাহার। ২০০৫ সালে লন্ডন গিয়ে ব্রিটিশ বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের নামে (বিবিআইজি) কথিত ওই তিন পরিচালক ও আরও একজন স্বদেশে বিনিয়োগ করার জন্য প্রবাসীদের আহ্বান জানান। ঢাকা রিজেন্সি হোটেল এন্ড রিসোর্ট নামে ৫ তারকাবিশিষ্ট একটি হোটেলে বিনিয়োগ করার জন্য তারা ব্রিটেন প্রবাসী বাঙালিদের উদ্বুদ্ধ করেন। ব্যবসা বাণিজ্য দেশে করলে দেশের লাভ হবে! এসব ভেবেই এগিয়ে আসেন প্রবাসীরা। ২৫ হাজার পাউন্ড থেকে এক লাখ ৭৫ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত, নানা হিসাবে যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী বিনিয়োগ করেছেন। বিনিয়োগের শর্তের মধ্যে ছিল, বিনিয়োগকারীরা সকলেই কোম্পানির পরিচালক হিসেবে মনোনীত হবেন। তারা কোম্পানির লভ্যাংশ আইন অনুযায়ী নিয়মমাফিক পাবেন। পরিচালকের সুযোগ সুবিধাও ভোগ করবেন প্রত্যেকবিনিয়োগকারী। সেইমতে, বিনিয়োগের পর তখন সব বিনিয়োগকারীকেই ইউনিক কোডসহ আইডি কার্ড দিয়ে এবং ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লিমিটেডের প্যাডে লিখিতভাবে জানানো হয় যে, তারা ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের পরিচালক। কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারলেন যে, তারা প্রতারণার শিকার। হোটেল পরিচালনাকারী কোম্পানিতে দেখা গেল, বিনিয়োগকারীদের কারও নাম নেই। কোম্পানি করা হয় শুধু উদ্যোক্তা তিন পরিচালক মুসলেহ আহমেদ, কবির রেজা ও আরিফ মোতাহার এবং তাদের মা, স্ত্রীসহ সাতজনের নামে। হোটেল উদ্বোধনের ২ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রবাসী পরিচালকরা তাদের বিনিয়োগের কোনো লভ্যাংশ না পেয়ে যোগাযোগ করেন তৎকালীন এমডি মুসলেহ আহমেদের সঙ্গে। ২০১০ সালের শেষের দিকে মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে লভ্যাংশ প্রদান করা হয়। এ সব ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের মনে নানা প্রশ্ন জন্ম দেখা দেয়। তারা বিষয়টি নিয়ে সাবেক নির্বাহী পরিচালক মুজিবুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, বাকি ৩ পরিচালকের নানা অসততার কারণে তিনি কোম্পানি ছেড়ে এসেছেন ও মামলার মাধ্যমে কিছু টাকা উদ্ধার করেছেন যা বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি রিজেন্সির অভিযুক্ত পরিচালকদের ব্যাপারে বিনিয়োগকারীদের সাবধানও করে দেন। এতে করে আরও বিচলিত হয়ে পড়েন বিনিয়োগকারীরা। পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন জয়েন্ট স্টক ফার্মসে যোগাযোগ করলে জানতে পারেন, ওই তিন নির্বাহী পরিচালক মুসলেহ আহমেদ, কবির রেজা ও আরিফ মোতাহার জালিয়াতির মাধ্যমে শতকরা ৫২ ভাগ শেয়ার বিনা বিনিয়োগে কোম্পানির পরিচালক হিসেবে তাদের স্ত্রী ও মায়ের নামে সংযুক্ত করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৮১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এবং কো��্পানির অ্যাকাউন্ট থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নামে বেনামে দেশে বিদেশে ঘর বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। পাশাপাশি তারা আরও জানতে পারেন, তিন পরিচালক কোম্পানিকে শেয়ার মার্কেটে নিয়ে যাওয়ার জন্য সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশনে আবেদন করেছেন। বিনিয়োগকারীরা উদ্যোগ নিয়ে বিষয়টা সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে জানালে জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস হয়ে যায়। সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনার তাদের আবেদন খারিজ করে দেন। বিনিয়োগকারীরা এরপর বিভিন্ন সময় তিন পরিচালকের কাছে লভ্যাংশ ও পরিচালক পদের জন্য চাপ দিতে থাকলে কোনো ধরনের লভ্যাংশই দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দেন তারা। এমনকি বেশি কথা বললে জেলে দেয়ার হুমকির পাশাপাশি বাড়াবাড়ি করলে প্রাণে মারারও হুমকি দেয়া হয়। যেখানে সরকারসহ সর্বমহলে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে প্রবাসী বিনিয়োগের কথা, সেখানে এই ধরনের জালিয়াতির কারণে দেশে প্রবাসী বিনিয়োগ আজ চরম হুমকির মুখে। কিছু অসৎ ব্যক্তির জন্য আজ ১৫০ প্রবাসী বিনিয়োগকারী আর্থিকভাবে নিরাপত্তাহীন এবং দেশের ভাবমূর্তিও আজ বহির্বিশ্বে প্রশ্নের সম্মুখীন। কথিত তিন পরিচালকের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে বিনিয়োগকারীরা এখন চাঁদাবাজি, ছিনতাই, চুরি, মানহানিসহ বিভিন্ন ধরনের হয়রানিমূলক মামলা মাথায় নিয়ে খাবি খাচ্ছেন। হামলা, মামলা বিষয়টা যখন কিছুতেই সুরাহা হচ্ছিল না, তখন বিনিয়োগকারীরা কথিত তিন পরিচালকের কাছে সমাধানের পথ জানতে চান। তাতে তিন পরিচালকের প্রস্তাব ছিল, বিনিয়োগের সমপরিমাণ টাকা তারা ফেরত দিতে রাজি আছেন। কিন্তু এই টাকা বিনিয়োগের ফলে সৃষ্ট সম্পদ বা বিনিয়োগকারীদের কোনো লাভ দিতে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগকারীরা অল্প কিছু লাভসমেত বিনিয়োগের টাকা ফেরত চেয়ে প্রস্তাব দেন, যাতে তাদের এ সংক্রান্ত খরচগুলো অন্তত কাটিয়ে ওঠা যায়। কিন্তু তিন পরিচালক তাতে রাজি নন। বিনিয়োগকারীরা এরপর তিন পরিচালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের ব্যবসা বাণিজ্য ও প্রবাসী বিনিয়োগ সংক্রান্ত দপ্তরগুলোতে যোগাযোগ করেন। কিন্তু সেখানেও তারা কোনো ফল পাননি। পরবর্তীতে তারা ড. কামাল হোসেন অ্যাসোসিয়েটসের মাধ্যমে একটি লিগাল নোটিশ পাঠান তিন পরিচালকের উদ্দেশে। সেই লিগাল নোটিশেও কিছু লাভসমেত বিনিয়োগের টাকা ফেরত দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্য আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু তাতে মনোযোগ না দিয়ে তিন পরিচালক প্রথমে বিনিয়োগকারী শাহ আশরাফের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। পরবর্তীতে তাদের কাছে চাঁদা চাওয়া হচ্ছে বলে আরও ৭ বিনিয়োগকারীর নামে মামলা ঠুকে দেন। এরপর বিনিয়োগকারীরাও পাল্টা মামলা করেন। দু’পক্ষে থেকে একের পর এক মামলা হতে থাকে। বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগের টাকা ও তার বিনিয়োগ-লাভ দাবি করে মামলা করলেও তিন পরিচালক বিনিয়োগকারীদের নামে ভুয়া, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, অপহরণের অভিযোগ এনে এখন পর্যন্ত মোট ১৬টি মামলা করেছেন। ঢাকার যাত্রাবাড়ী, খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, পল্টন থানা থেকে শুরু করে সিলেট, যশোর, ঝিকরগাছা থেকেও মামলা দেয়া হয়েছে প্রবাসীদের বিরুদ্ধে। যদিও তাদের অনেকেই এর আগে বাংলাদেশে কখনো আসেননি। অনেকেই কোনোদিন আরিচাঘাট পার হননি। সিলেট থেকে এসে আবার লন্ডন ফিরেছেন। অথচ এখন তাদের জেল খাটতে হচ্ছে যশোর, ঝিকরগাছায় গিয়ে। পাল্টা মামলা তারাও করেছেনে। কিন্তু তাতে মামলা পরিচালনাকারী উকিল ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের টাকা দেয়া ছাড়া ন্যায়বিচারের কিছুই মেলেনি। তিন পরিচালকের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকা থেকে দায়েরকৃত মামলাগুলো হচ্ছে, সিআর মামলা নং ৭৩/২০১৩, ধারা ৩২৩/৩৪১/৩৯৩/৩৯৪/৩৭৯/৫০৬। সিআর মামলা নং ৮৩/২০১৩, ধারা ৪২০/৪৬৩/৫৩৭/৪৬৮/৪৭১/৫০৬। সিআর মামলা নং ১৫৫/১৪, ধারা ১৪৩/৫০৬/৩৮০/৪০৬/৪২৭/৩৪। সিআর মামলা নং ১৫৬/১৪, ধারা ৩২৩/১৪৭/৪৪৭/৩২৪/৩২৫/৩৮০/৪২৭/৫০৬/৩৪। জিআর মামলা নং ০৪/১৪৭, তারিখ ১১/৯/১২, ধারা ৩৮৫/৫০৬। পল্টন থানা মামলা নং ২৮/১৬১। তারিখ ২৭/৪/১৪, ধারা ৩২৩/৩৭৯/৫০৬/৩৪। পল্টন থানা মামলা নং ২৭/১৬০, তারিখ ২৬/৪/১৪, ধারা ৩২৩/৩৭৯/৫০৬/৩৪। যাত্রাবাড়ী থানা মামলা নং ৫৫/২৩১, ধারা ৩২৩/৩৪১/৩৮৫/৩৭৯/৫০৬/৩৪। সিলেট মুগলাবাজার থানা মামলা নং ১/৫৫, তারিখ ১/৫/১৪, ধারা ৪০৬/৩৪২/৩২৩/৩৭৯/৩৪। যশোর কোতোয়ালি থানা মামলা নং ৪০/৫১৬, তারিখ ৮/৫/১৪, ধারা ৪২০/৪০৬। ঝিকরগাছা থানার মামলাটি হয়েছে কিছুদিন আগে। মামলা নম্বরটি এখনও উদ্ধার করা না গেলেও জানা গেছে ৪২০ ও ৪০৬ ধারায় এতে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে এ ধরনের আরও তিনটি মামলা দেয়া হয়েছিল বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে। সেগুলো আদালতে খারিজ হয়ে গেছে। বিনিয়োগকারীরা বলছেন, আরও মামলার প্রস্তুতির ইঙ্গিত পেয়েছেন তারা। জানা গেছে, তিন পরিচালক এসব মামলা পরিচালনার জন্য কায়েস মুন্সী নামক একজন আইনজীবীর নেতৃত্বে তিনজনের একটি দলকে নিয়োগ দিয়েছেন। তারাই এসব মামলা দেয়ার দায়িত্ব পালন করছেন। তবে এসব মামলাবাজি করেও তিন পরিচালককে তারা বাঁচাতে পারেননি। প্রবাসীদের করা একটি মামলায় গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ওই তিন পরিচালকের মধ্যে দুইজন, মুসলেহ আহমেদ ও আরিফ মোতাহার গ্রেপ্তার হন। কিন্তু কিছুদিন লন্ডনে পলাতক থেকে সব বন্দোবস্ত করেন আরেক পরিচালক কবির রেজা। দুর্ভোগ, ভোগান্তি কাঁড়ি কাঁড়ি মামলা আর হামলার ফলে বিনিয়োগকারী প্রবাসীরা এখন বিপর্যস্ত। ১৮ ফেব্রুয়ারি তিন পরিচালক গ্রেপ্তার হবার পর সুবিচারের আশায় বুক বাঁধেন প্রবাসীরা। তাদের একটি প্রতিনিধিদল তখন দেশে আসে। ঢাকায় তাদের কোনো থাকার জায়গা নেই! নিজের শ্রমের টাকায় গড়ে ওঠা হোটেলে ছাড়া তারা কোথাও থাকতেও রাজি ছিলেন না। তারা গিয়ে হোটেলে উঠেই দেখতে পান বিশৃঙ্খলা ও অব্যবস্থাপনার চিত্র। তিন পরিচালক জেলে থাকায় যাতে কেউ হোটেলে কোনো বিশৃঙ্খলা না ঘটে এবং নিজেদের ওপর হামলার আশঙ্কা থেকেও নিরাপত্তা চেয়ে ও হোটেলের কল্যাণার্থে আদালতের কাছে একটি আদেশ প্রার্থনা করেন প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা। আদালত তাদের নিরাপত্তা দেয়া ও হোটেল এলাকায় কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা না করতে পারে সেই মর্মে ১৪৫ ধারা জারি মোতাবেক নির্দেশনা প্রদান করেন। কিন্তু তিন পরিচালকের মধ্যেকার একজন কবির রেজা তখন দেশে এসে প্রথমে থানা পুলিশ ম্যানেজ করেন। এরপর ২৭ এপ্রিল বাকি দুই সঙ্গীর জামিন হলে কবির রেজার নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা হোটেলে ঢুকে প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের চুক্তি অনুযায়ী যারা প্রত্যেকেই পরিচালক, তাদের ওপর হামলা চালান। তাদের হোটেল থেকে বের করে দেন। এসময় তারা লন্ডনপ্রবাসী বিনিয়োগকারী কাজী কয়সর আহমদকে পিটিয়ে আহত করেন। তার কাছে থাকা নগদ অর্থ এবং দুটি স্মার্টফোন কেড়ে নেয়া হয়। জোরপূর্বক তার ব্যাংক কার্ড থেকে হোটেলের কার্ড রিডারের মাধ্যমে ৯৪ হাজার টাকা সরিয়ে নেয়া হয়। কাজী কয়সরের ওপর সরাসরি দৈহিক আক্রমণ চালান কবির রেজা। কয়সরকে কয়েকজন সন্ত্রাসী জোরপূর্বক হোটেল থেকে নামিয়ে হোটেলের পিছনে নিয়ে যায়। সেখানে কবির রেজা কালো মার্সিডিজ গাড়ি থেকে নেমে কয়সরকে উপর্যুপরি কিল ঘুষি মারতে থাকেন। কয়সর মাটিতে লুটিয়ে পড়লে কবির রেজা তার বুকে পিঠে লাথি মারতে শুরু করেন। একপর্যায়ে কবির রেজা সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে তা কয়সরের দিকে তাক করে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এরপর তাকে হোটেলের ভিতরে নিয়ে সারা রাত একটি কক্ষে বন্দী করে রাখা হয়। পরদিন সকালে কবির রেজা একটি ওয়ানওয়ে টিকেট ধরিয়ে দিয়ে কয়সরকে হুমকি দিয়ে বলেন, সে যাতে আর কখনো বাংলাদেশে পা রাখার কথা না ভাবে। এর চেয়েও কঠিন ভোগান্তির অভিজ্ঞতা বলতে পারবেন এই প্রবাসীরা। বিনিয়োগকারী প্রবাসী সামছুদ্দোহা জানান, ‘একদিন মামলার হাজিরা দিতে লন্ডন থেকে বিমানে এসে ঢাকা বিমানবন্দরে নামলাম। বিমানবন্দরের ঝামেলা চুকিয়ে কোর্টে পৌঁছাতে একটু দেরি হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের কোনো কথাই আদালত কানে তুললেন না। দেরি করার অপরাধে আমাদের বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেয়া হলো। সে যে কী অভিজ্ঞতা! যে এর মধ্য দিয়ে না গেছে সে বলতে পারবে না। অত বড় জার্নি করে এসে পাঁচটা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা তো অসম্ভব! আদালত আমাদের দেরিটা দেখলেন, কিন্তু আমাদের বিরুদ্ধে যে অন্যায়টা হচ্ছে তা কেউ দেখছেন না। ঝিকরগাছা কোনদিকে আমি তা জানিও না। জীবনে কোনোদিন সেখানে যাইনি। এখন সেখান থেকে আমাদের নামে মামলা দেয়া হয়েছে। এগুলো দেখার কেউ নেই!’ মঞ্জুর হোসেন নিজে বিনিয়োগ করেছেন। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের দিয়ে বিনিয়োগ করিয়েছেন। তার একটি ছোট্ট পুত্রসন্তান আছে। শিশুছেলেটি অন্যদের মতো স্বাভাবিক নয়। পিতা হিসেবে তো বটেই, ব্রিটেন সরকারের দেয়া দায়িত্ব অনুযায়ীও অসুস্থ শিশুটিকে দেখভালের দায়িত্ব তার। সেই ছেলে তাকে ছাড়া চলতে পারে না। কিন্তু তিনি ছাড়া পাননি। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এসে কিছুদিন জেল খেটে গেছেন! পল্টন, খিলক্ষেত, যাত্রাবাড়ী, তিন থানাতেই চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মামলা আছে তার নামে। এই মুহূর্তে তার মাথার ওপর দিয়ে ঝড় যাচ্ছে। সারা জীবনের সঞ্চয় তো আটকে গেছে রিজেন্সির পরিচালকদের চক্রান্তে। এখন তিনি কী করবেন! সাদাত হোসাইন মনির লন্ডনে অনেকধরনের ব্যবসা করেন। তিনি ও তার স্ত্রী দুজনেই বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন আর তারা কোনো ব্যবসা চালাতে পারছেন না। সব কিছুতেই লস হচ্ছে। ব্যবসার মূল মানুষটা যদি উদ্বিগ্ন থাকে, দেশে গিয়ে মামলা খেয়ে আদালতে, থানায় ঘুরে বেড়ায়, তাহলে ব্যবসা এগুবে কীভাবে! অনেকেই আছেন, যারা সঞ্চয়ের পুরোটা দিয়েছেন আগেই। মামলা লড়তে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। এখন আর বিদেশ বিভূঁইয়ে টিকে থাকার মতো অবস্থায় নেই তারা। কিছু না হলে শেষ পর্যন্ত পথে বসতে হবে তাদের। প্রবাসীরা টাকার মেশিন! বাংলাদেশের সব মহলের অসাধুদের কাছেই প্রবাসীরা হচ্ছেন একেকজন টাকার মেশিন! প্রবাসীদের পেলেই তারা ফন্দি ফিকির করেন, নানা ধরনের ভুল তথ্য দেন, এটা সেটা করতে হবে বলে, ‘আমি করে দেব’ বলে শেষে টাকা দাবি করেন! এভাবে যে যেভাবে পারেন এই প্রবাসীদেরও শুষে নিয়েছেন। নানা জায়গায় গেছেন তারা। কিন্তু তাদের কাজ হয়নি, সমস্যার সমাধান হয়নি। কারণ এরা তো প্রবাসী। এদের সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে তো টাকার উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। তাই যে যেভাবে পেরেছেন সমস্যাটাকে জিইয়ে রেখেছেন। তবে কেউ কেউ আন্তরিকভাবেই এর সমাধান চেয়েছেন, তারাও প্রবাসী। পাঁচ বছর আগেই যখন বিনিয়োগকারীরা এই প্রতারণা ও জালিয়াতির ব্যাপারে সন্দেহ করেন তখন প্রখ্যাত আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের মাধ্যমে এই তিন পরিচালকের কাছে কতিপয় সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব চান। পরবর্তীতে তারা টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার এমপি রোশনারা আলীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বরাবরে আবেদন করেন বিষয়টির সুষ্ঠু আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে প্রকল্পটিতে জড়িত প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের লগ্নির সুরক্ষার জন্যে। ওই চিঠির পরপরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু মাঝপথে সেটা থেমে যায়। এরপর ব্রিটিশ এমপি ফিটজপ্যাট্রিকের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আবেদন জানানোর পর রিজেন্সির অভিযুক্ত তিনজন নিজেদের উদ্যোগে সমাধানের আশ্বাস দিয়ে সেই চিঠি মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করে নিয়ে আসেন। তিন পরিচালকের নামে দুদকেও অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্তের আশ্বাসও দিয়েছেন তারা। প্রতিকার চেয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। তারও কোনো ফল নেই। এখন পর্যন্ত এ সমস্যাটা ঝুলে আছে। অথচ আদালত, প্রধানমন্ত্রী, থানা-পুলিশ, বৈদেশিক তৎপরতা, দুর্নীতি দমন কমিশন, কিছুই বাকি রইল না। যেখানে একটি দেওয়ানি মামলা বা উচ্চ আদালতে প্রতিকার চেয়ে একটা রিট করাটাই ছিল যথেষ্ট, সেখানে আইনজীবীরা ধরে ধরে প্রত্যেককে দিয়ে আলাদা আলাদা মামলা করিয়েছেন। বিনিময়ে তাদের হয়েছে পোয়াবারো। আরও ডুবেছেন এই প্রবাসীরা। নিজ দেশে এসে এমন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাওয়াটা যে কারও জন্যই অতীব দুঃখের এবং পুরো জাতির জন্য তা লজ্জাজনক। তিন পরিচালকের কীর্তি রিজেন্সির অভিযুক্ত তিন পরিচালক নানাভাবে প্রবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও আইনি জটিলতায় পড়ে হোটেল ব্যবসার লভ্যাংশের টাকা তারা তুলতে পারছেন না। কিন্তু তাই বলে থেমে নেই তাদের তৎপরতা। কোম্পানির টাকা নানাভাবে হাতিয়ে নিচ্ছেন তারা। বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিনিয়োগের টাকা অন্যত্র সরিয়ে ফেলছেন তারা। মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ ও দুর্নীতি নিয়ে দুদক তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে। তিন পরিচালকের দাবি, অভিযোগকারীরা কোম্পানির কেউ নয়। তারা শেয়ারহোল্ডারমাত্র। বার্ষিক লভ্যাংশের একটা অংশ (এজিএম) ছাড়া তাদের আর কোনো পাওনা থাকতে পারে না। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে, শেয়ারহোল্ডার হলে ব্রিটিশ বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপের (বিবিআইজি) দরকার কী? এটা তো বিনিয়োগের জন্যই করা হয়েছিল। বিনিয়োগকারীদের পরিচালক কার্ডই বা দেয়া হয় কেন? খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চার পরিচালক বিবিআইজি তৈরি করলেও পরে তারা তা ভেঙে দেন একজন চলে গেলে। বাকি তিন পরিচালক নতুন নাম দিয়ে কাজ শুরু করেন। ফলে আগের কোম্পানির মাধ্যমে হওয়া চুক্তিকে তারা আর গুরুত্ব দেন না। তারা মনে করেন যে, এটা তারা ম্যানেজ করে ফেলতে পারবেন। প্রবাসীদের বিনিয়োগ করা ৬০ কোটি টাকা দিয়ে জমি কেনা হয়েছে বলে প্রথমে জানান তারা। দেখা যায়, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৫ সালে বিবিআইজির মাধ্যমেই সেই জমি কেনা হয়েছে। তার দাম ছিল মাত্র ৩৯ কোটি টাকা। এ থেকে স্পষ্ট হয় শুরু থেকেই অনিয়ম করে আসছিলেন এই তিনজন। এ প্রসঙ্গে অভিযুক্তদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে আরিফ মোতাহার ও মুসলেহ আহমেদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরিচালক কবির রেজা ফোন ধরলেও তিনি কোনো মতামত দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আপনারা যা খুশি তা লিখতে পারেন। কিন্তু আমার বক্তব্য নিতে হলে সময় করে আসতে হবে। আমাকে সময় দিতে হবে। আমি ডকুমেন্ট ছাড়া তো কথা বলব না। এখন এ বিষয়ে কথা বলতে পারব না। পরে এক সময় রিজেন্সিতে আমার অফিসে আসেন।’ এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আরও আলাপের চেষ্টা চলছে। আগামীতে ফলোআপ প্রতিবেদনে তা তুলে ধরা হবে। একদিকে সরকার প্রবাসীদের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ করতে এসে প্রবাসীরা দেশে জেল খাটছেন। বিনিয়োগ করে লভ্যাংশ তো পাচ্ছেনই না, উল্টো প্রতারণার প্রতিবাদ করায় নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা। এ ধরনের একটি ঘটনাই যথেষ্ট। এটা কার না জানা, প্রবাসীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ খুব ভালো। মুহূর্তেই সবাই জেনে যাচ্ছেন এসব ঘটনা। এভাবে চলতে থাকলে প্রবাসীরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। দ্রুতই সরকারকে এগিয়ে এসে এই সমস্যার আশু সমাধানের উদ্যোগ নেয়া দরকার। অভিযুক্তদের বিচারের মুখোমুখি করে প্রবাসীদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগের সমস্যাদি সমাধানের জন্য আলাদা বিচারিক সেল গঠনের উদ্যোগ নেয়া দরকার।